জার্মানিতে জেন-জি বিক্ষোভে ফ্রাঙ্কফুর্টে দোকানপাটে লুটপাট

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:০৬ পিএম

শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বিরোধিতা করে জার্মানির ৩৪টি শহরে রাজপথে নামেন তরুণেরা। ফ্রাঙ্কফুর্টে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিলে অন্তত দুটি দোকানে লুটপাট, কয়েকটি স্থাপনায় ভাঙচুর এবং জরুরি সেবাকর্মীদের লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।

জার্মানির বিভিন্ন শহরে জেনারেশন জেড বা জেন-জি তরুণদের নেতৃত্বে আয়োজিত বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিয়েছে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাতে দেশটির আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ফ্রাঙ্কফুর্টে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা কয়েকটি দোকানে লুটপাট চালান। এ সময় অন্তত দুটি দোকান লুট করা হয় এবং আরও কয়েকটি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ অভিযান চালায়।

শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বিরোধিতা করে দেশটির বড় শহরগুলোতে কয়েক হাজার তরুণ রাজপথে নামেন। জার্মানির ৩৪টি শহরে এই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ছিল রাজধানী বার্লিন, ফ্রাঙ্কফুর্ট ও মিউনিখ।

‘জেন জেড রেগেল্ট’ (Gen Z regelt) বা ‘জেন-জি দায়িত্ব নিচ্ছে’ নামের একটি প্রচারগোষ্ঠী বিক্ষোভের আয়োজন করে। আয়োজকদের দাবি, তরুণদের ওপর ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ কমানো, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা বন্ধ করতে হবে।

ফ্রাঙ্কফুর্ট পুলিশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানায়, শহরে সহিংস পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে। কেন্দ্রীয় এলাকায় কয়েকটি দোকানের জানালা ভাঙচুর করা হয়েছে। জরুরি সেবাকর্মীদের লক্ষ্য করে পেট্রলবোমাও নিক্ষেপ করা হচ্ছে। এ কারণে সাধারণ মানুষকে শহরের কেন্দ্রীয় এলাকা এড়িয়ে চলতে অথবা সেখান থেকে সরে যেতে অনুরোধ করা হয়েছে।

শনিবার বিকেলের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আয়োজকদের প্রত্যাশার চেয়ে কম ছিল। আয়োজকেরা প্রথমে ১ লাখ ৮২ হাজার মানুষের অংশগ্রহণের আশা করেছিলেন। তবে ফ্রাঙ্কফুর্ট, মিউনিখ ও বার্লিনের পুলিশ সর্বোচ্চ ১৮ হাজার বিক্ষোভকারীর উপস্থিতির কথা জানিয়েছে। আয়োজকদের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা প্রায় ৩৬ হাজার অংশগ্রহণকারীর সংখ্যারও অর্ধেক এটি।

জার্মান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হ্যালোইন উৎসবের সঙ্গে একই সময়ে অনুষ্ঠিত শনিবারের বিক্ষোভের বেশির ভাগই শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো আন্দোলনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করতে পারে বলে সতর্ক করেছে তারা।

হামবুর্গে কয়েকটি ব্যারিকেডে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

বার্লিনে শনিবারের সমাবেশে ‘জেন জেড রেগেল্ট’-এর মুখপাত্র লিনা ফ্রিডরিখ বলেন, তাঁরা যুদ্ধ ও জবরদস্তির পরিবর্তে শান্তি ও স্বাধীনতার দাবিতে রাজপথে এসেছেন।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থায় আরও ভালো সহায়তা নিশ্চিত করা তাঁদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি। তাঁরা বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বিরোধী এবং সমাজের সবার মধ্যে দায়িত্বের বোঝা আরও ন্যায্যভাবে বণ্টনের পক্ষে।

বিক্ষোভ ঘিরে সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কায় জার্মানির বিভিন্ন শহরের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আগেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়। বার্লিনের বিলাসবহুল কেনাকাটার এলাকা কুরফ্যুরস্টেনডামসহ বিভিন্ন স্থানের দোকানপাটের জানালা সুরক্ষিত করা হয়। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আগেভাগে বন্ধ রাখার পরিকল্পনাও করে।

জার্মানির ফেডারেল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির উগ্র বামপন্থী চরমপন্থী মহলের কিছু অংশ এবং বিদেশি উগ্রপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি গোষ্ঠী বিক্ষোভে সমর্থন জোগানোর প্রচেষ্টায় যুক্ত হয়েছে।

হেসে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমান পোজেক বলেন, ফ্রান্সের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও সহিংসতার দৃশ্য তাঁদের মনে রয়েছে। সেখানে দোকানপাটে লুটপাট, বাড়িঘর ও পুলিশের গাড়িতে আগুন এবং পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। জার্মানিতে যেন ফ্রান্সের মতো পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

আয়োজকদের বক্তব্য, ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জার্মানিতে তরুণ প্রজন্মের ওপর অর্থনৈতিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। শিক্ষা, সামাজিক সেবা, সংস্কৃতি ও স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন না থাকা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি তাঁদের উদ্বেগের বড় কারণ।

মিউনিখের সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল ১৮ বছর বয়সী স্টিভের। চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তরুণদের উদ্বেগের জবাবে সরকার ব্যয় সংকোচন অব্যাহত রাখা এবং তাঁদের ওপর আরও বোঝা চাপানো ছাড়া কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

তিনি বলেন, সরকার তাঁদের দাবি উপেক্ষা করা বন্ধ না করা পর্যন্ত তাঁরা শান্তিপূর্ণ সমাবেশের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করে যাবেন।

জার্মানি দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ায় পেনশন ও সরকারি সেবার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে কর্মক্ষম জনসংখ্যা কমে আসছে। এই পরিস্থিতি তরুণদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

বিক্ষোভটি তরুণদের নেতৃত্বে পরিচালিত বলে দাবি করা হলেও এর পেছনে কারা সক্রিয় এবং আন্দোলনটি প্রকৃত অর্থেই কতটা তরুণনির্ভর—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের সংগঠনের অংশগ্রহণ রয়েছে।

জার্মানির জাতীয় স্কুলশিক্ষার্থী সংগঠন বিএসকে (BSK) এই উদ্যোগ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছে। সংগঠনটি আগামী ২০ নভেম্বর আলাদা একটি বিক্ষোভ কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে।

বার্লিনের টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী শন বেকার জানান, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের জরাজীর্ণ অবস্থা তুলে ধরতে তিনি শনিবারের বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ভবনের ভেতরে প্রবেশ করলে অনেক কক্ষকে পরিত্যক্ত ভবনের মতো মনে হয়। অথচ শিক্ষার্থীদের নিয়মিত সেখানেই পড়াশোনা করতে হচ্ছে।

জার্মানির এই বিক্ষোভ ইউরোপজুড়ে চলতি বছরে জেন-জি নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের ধারাবাহিকতা। সার্বিয়ায় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে আন্দোলন নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন নেতাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে ফ্রান্সের বিভিন্ন বিক্ষোভ সহিংসতা ও লুটপাটে রূপ নিয়েছে।

জার্মানির সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট হয়েছে, শিক্ষা, জীবনযাত্রার ব্যয় ও সামরিক নিয়োগের মতো ইস্যুতে তরুণদের অসন্তোষ রাজপথে বড় আকার ধারণ করছে। তবে আন্দোলনের দাবির পাশাপাশি সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনা দেশটির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সূত্র: রয়টার্স।

এএইচএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত