অসুস্থতায় শরীর যখন ভেঙে পড়ে কিংবা মন খারাপের দিনে একটু প্রশান্তি পেতে আমরা কী খুঁজি? উত্তরটা সংস্কৃতিভেদে ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু একটি বিষয় প্রায় সব দেশেই সাধারণ—তা হলো এক বাটি ধোঁয়া ওঠা পুষ্টিকর ঝোল বা ব্রোথ (Broth)। আধুনিক বিশ্বে এটি এখন একটি ‘ওয়েলনেস ট্রেন্ড’ বা স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার অংশ হয়ে উঠলেও, এর শিকড় প্রোথিত আছে হাজার বছরের পারিবারিক স্মৃতি ও ঐতিহ্যে।
দেশ ভেদে ঝোলের বৈচিত্র্য
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ: আমেরিকায় সর্দি-জ্বরে ‘চিকেন নুডলস স্যুপ’ প্রথাগত পথ্য। অন্যদিকে ইতালীয়রা পছন্দ করে তাদের দাদি-নানিদের হাতের তৈরি ‘পাসতিনা ইন ব্রোদো’ (হাড়ের স্টকে ছোট পাস্তা)।
এশিয়া: চীন, ভিয়েতনাম বা কোরিয়ায় চালের জাউ বা ‘কঞ্জি’ (Congee) শিশুদের জন্য পরম মমতায় রান্না করেন মায়েরা। কোরিয়ায় গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে শরীর চাঙা করতে খাওয়া হয় ‘সামগিয়ে-তাং’ (ভেষজ মিশ্রিত আস্ত মুরগির ঝোল)। জাপানে নতুন বছর উদযাপনে ‘ও-জোনি’ নামক বিশেষ স্যুপ অপরিহার্য।
পূর্ব ইউরোপ: ইউক্রেনসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে ‘বর্শট’ (Borscht) নামক লাল বিটের স্যুপ অত্যন্ত জনপ্রিয়।
স্টক বনাম ব্রোথ: পার্থক্য কী?
অনেকে স্টক (Stock) ও ব্রোথকে (Broth) একই মনে করেন, তবে রন্ধনশৈলীতে এদের পার্থক্য রয়েছে।
ব্রোথ: মূলত মাংস, সবজি এবং মসলা দিয়ে কয়েক ঘণ্টা হালকা আঁচে ফুটিয়ে তৈরি করা হয়। এটি স্বাদে হালকা এবং সরাসরি খাওয়ার উপযোগী।
স্টক: এটি মূলত পশুর হাড় থেকে তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় (কখনও দুই-তিন দিন) ধরে হাড় ফোটানোর ফলে এতে প্রচুর পরিমাণ কোলাজেন ও পুষ্টি উপাদান মিশে যায়। এটি ব্রোথের তুলনায় বেশি ঘন ও আঠালো হয়।
ঐতিহাসিকভাবে ব্রোথ তৈরির পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল মিতব্যয়িতা ও পুষ্টির সর্বোচ্চ ব্যবহার। যে হাড় বা মাংসের শক্ত অংশ চিবিয়ে খাওয়া যেত না, তা ফুটিয়ে নির্যাস বের করে নেওয়া হতো। এক সময় যা ছিল দরিদ্র মানুষের বেঁচে থাকার উপায়, আজ তাই বিলাসবহুল সুপারমার্কেটে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে ‘হেলথ ড্রিঙ্ক’ হিসেবে। নিউইয়র্কের মতো বড় শহরগুলোতে এখন কফির বদলে ছোট এক কাপ হাড়ের স্টক (Bone Broth) বিক্রি হচ্ছে ১০ ডলারে।
প্রাচীন চীনা চিকিৎসা শাস্ত্রেও ঝোল বা স্যুপ খাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, হাড় ও মাংসের ঝোলে থাকা অ্যামিনো অ্যাসিড ও কোলাজেন শরীরের প্রদাহ কমাতে এবং ঠান্ডা লাগার উপসর্গ উপশমে সাহায্য করে। এটি কেবল পেটের জন্য নয়, বরং মস্তিষ্কের প্রশান্তির জন্যও কার্যকর।
সব মিলিয়ে, বিশ্বের যে প্রান্তেই যান না কেন, এক বাটি গরম স্যুপ কেবল শরীর নয়, আত্মাকেও উষ্ণ করে তোলে। রন্ধনশালায় কেউ না কেউ এখনও পরম মমতায় ফোটানো স্যুপের হাঁড়ির দিকে নজর রাখছেন—এটিই হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে আদিম ও অকৃত্রিম ভালোবাসা।
ইফতারে ভিন্ন স্বাদের চকলেট সাবুদানার পায়েস
ঘরোয়া উপায়ে তৈরি করুন চিজ পটেটো ফ্রিটার্স
